বাংলাদেশের জনগণের জীবনে অশনিসংকেত।

বাংলাদেশের জনগণের জীবনে অশনিসংকেত।

1492573630381

মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম নামে চরমোনাইর পীর ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির গতকাল তাদের অফিসে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় দম্ভোক্তি করে বলেছেন, ‘এমন শক্তিশালী আন্দোলন তারা করবেন যাতে শুধু ভাস্কর্যই নয়, প্রধান বিচারপতিকে পর্যন্ত তারা অপসারণ করবেন’ (ডেইলি স্টার, ১৭.৪.২০১৭)। উপরোক্ত পীর সাহেবের এই দম্ভোক্তি থেকে বোঝা যায়, শুধু হেফাজতে ইসলাম ও তার আমির শাহ আহমদ শফীই নয়, বিভিন্ন নামধারী ইসলামী সংগঠনগুলো সুযোগ বুঝে বাংলাদেশে ‘ইসলাম প্রতিষ্ঠার’ জন্য এখন মরিয়া হয়ে মাঠে নামার ব্যবস্থা করছে। লক্ষ্য করার বিষয় যে, ইসলামের ধ্বজাধারী পাকিস্তানিরা এ দেশে ক্ষমতায় থাকার সময় যা করার সাহস করেনি এখন স্বাধীন বাংলাদেশে এসব সংগঠন তাই করার জন্য নিজেদের যথেষ্ট শক্তিশালী মনে করছে। বিষয়টি মোটেই উপেক্ষা করার নয় এ কারণে, যে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে পৃথক করার অঙ্গীকার নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার মাতামাতি অবস্থা তৈরি হয়েছে। কওমি মাদ্রাসার সনদকে স্বীকৃতি প্রদান এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে একটি গ্রিক ভাস্কর্য অপসারণ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ও মনোভাব প্রকাশের পর আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা ও তাদের সরকারের শরিকরাও এখন প্রকাশ্যে এর সমালোচনায় নেমেছেন। সরকারের নীতির বিরোধিতায় যারা কখনও কিছু বলেন না, তাদেরও যে এই অবস্থায় আর স্থির থাকা সম্ভব হচ্ছে না_ এটা বর্তমান পরিস্থিতির এক উল্লেখযোগ্য দিক। কিন্তু এসব সত্ত্বেও বলা দরকার যে, পাকিস্তানিদের এ দেশ থেকে মেরে তাড়িয়ে দেওয়ার পরও এ দেশে ধর্মীয় রাজনীতির শক্তি কীভাবে বৃদ্ধি পেল এ নিয়ে তাদের মতো লেখক, বুদ্ধিজীবীদের কোনো ভাবনা নেই। তাদের মধ্যে চিন্তাভাবনার দিক থেকে দেউলিয়া কিছু লোক কর্তৃক এর জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করা এক উদ্ভট ও হাস্যকর ব্যাপার ছাড়া আর কী? ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার সময় পাকিস্তানিরা যা পারেনি ও করতে সাহস পায়নি, এখন তারা এক হাজার মাইল দূরে থেকে নিজেদের সমস্যা নিয়ে জর্জরিত অবস্থায় বাংলাদেশে তাদের ধর্মীয় আধিপত্য এভাবে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম_ এ চিন্তা শুধু দেউলিয়া নয়, উন্মাদতুল্য ব্যাপার। এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাঙালিরা যে কত অপদার্থ সেটাই কি প্রমাণিত হয় না? এ ঘরানার বুদ্ধিজীবী লেখক যারা সরাসরি পাকিস্তানকে এর জন্য দায়ী করেন না, তাদেরও এ বিষয়ে কোনো চিন্তাভাবনা নেই, চিন্তাভাবনার ক্ষমতা আছে বলেও মনে হয় না। যাই হোক, এই পরিস্থিতির কারণ আলোচনা এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য না হলেও প্রসঙ্গত এর উল্লেখ করা অবশ্যই দরকার। কারণ তাদের এই অবস্থার সঙ্গে এ দেশে ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান অনেকাংশেই দায়ী। এই অবস্থা বাইরে থেকে কারও সৃষ্টি নয়, এর ভিত্তি দেশীয় পরিস্থিতির মধ্যে গত কয়েক দশক ধরে তৈরি হয়েছে।

প্রথমত, ধর্ম রক্ষার নামে চরমোনাইর পীর সাহেবের উপরোক্ত দম্ভোক্তির কথাই বলা দরকার। তিনি এ কথা কোথায় পেলেন যে, ইসলাম ধর্ম রক্ষার জন্য এবং ইসলামের পাবন্দির জন্য মূর্তি ভাঙা দরকার? এই বক্তব্য আইএসের সর্বোচ্চ নেতা ভণ্ড, ধর্ষণকারী, সন্ত্রাসী এবং বর্বরতুল্য ইরাকের আবু বকর সিদ্দিক যেভাবে ঘোষণা করে ইরাক ও সিরিয়ায় অতি মূল্যবান নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থাপনা ধ্বংস করেছে, তার তুল্য কোনো কিছু তো ইসলামের ইতিহাসে নেই। মুসলমানরা নিজেরা মূর্তি বানায় না; কিন্তু অন্যের বানানো ভাস্কর্য এবং স্থাপনা ধ্বংস করতে হবে_ এটা তো কোথাও নেই। যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী নন তারা পর্যন্ত এটা স্বীকার করে থাকেন। ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠার পর মুসলমান আরবরা এশিয়া, আফ্রিকা, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, এমনকি ইউরোপেও তাদের শাসন কায়েম করলেও অন্যদের তৈরি ভাস্কর্য ও ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করেছে_ এমন দৃষ্টান্ত কোথায়? তুর্কির অটোমানও তাদের শত শত বছরের শাসনকালে তো এ কাজ করেনি। ভারতে সাম্রাজিক কারণে কোনো কোনো সুলতান ও বাদশাহ মন্দির ভেঙেছিলেন। গজনীর সুলতান মাহমুদ কয়েকবার সোমনাথ মন্দির লুট করেছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গে ধর্মের কী সম্পর্ক? সুলতান মাহমুদ একজন চরম লোভী ব্যক্তি ছিলেন। তার লোভ সম্পর্কে গজনীতেও অনেক গল্প প্রচারিত ছিল। আল বেরুনির মতো পণ্ডিত এবং ঐতিহাসিক, ফেরদৌসীর মতো কবি মাহমুদের রাজদরবারে ছিলেন। তারাও এদিক দিয়ে মাহমুদের কঠোর সমালোচক ছিলেন। আওরঙ্গজেব কিছু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। কিন্তু তিনি আবার উড়িষ্যায় মসজিদও ধ্বংস করেছিলেন। এসবের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এই আওরঙ্গজেব বাদশাহ হওয়ার জন্য নিজের বাবাকে জীবদ্দশায় আগ্রা দুর্গে তার মৃত্যু পর্যন্ত বন্দি রেখেছিলেন। নিজের বড় ভাই দারা শিকোর মাথা কেটে এক খাঞ্চায় করে পিতা শাহজাহানের কাছে পাঠিয়েছিলেন। এই নিষ্ঠুর কাজ যিনি করেছিলেন তার সঙ্গে ধর্মনিষ্ঠার বা প্রকৃত ধর্মচর্চার কী সম্পর্ক? তাছাড়া অন্যদিকে আওরঙ্গজেব অনেক মন্দিরের জন্যও অর্থ ও জমি দান করেছিলেন। এসবই তিনি করেছিলেন সাম্রাজিক প্রয়োজনে ও ব্যক্তিস্বার্থে। তার সঙ্গে ইসলাম বা কোনো ধরনের ধর্মীয় চিন্তার কোনো সম্পর্ক ছিল না।

ভারতের ইসলাম ধর্মের নিষ্ঠাবান প্রচারক ছিলেন। খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি, নিজামুদ্দীন আউলিয়া, সিলেটের শাহজালালের মতো ধার্মিক ব্যক্তিরা। তারা সুফি মতবাদ প্রচার করেছিলেন এবং শান্তিপূর্ণভাবেই ইসলাম প্রচার করেছিলেন। অন্য ধর্মের ওপর কোনো আক্রমণের চিন্তাই তাদের ছিল না। এ জন্য অমুসলমানদের কাছেও তারা শ্রদ্ধার পাত্র। ইসলামের ইতিহাসে চার খলিফা ও পরবর্তীকালে উমাইয়া এবং আব্বাসীয় শাসনামলে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের বিরাট অঞ্চল তাদের অধীনেও ছিল। কিন্তু তারা অন্য ধর্মের মূর্তি, ধর্মীয় স্থাপনা অথবা কোনো ধরনের শিল্প স্থাপনাই ধ্বংস করেননি।

কাজেই এখন চরমোনাইর পীর এবং শাহ আহমদ শফী হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে মূর্তি অপসারণের জন্য যে ‘শক্তিশালী ইসলামী আন্দোলন’ শুরু করবেন বলে আস্ফালন করেছেন, তার সঙ্গে ইসলাম ধর্মের এবং ইসলামের ‘গৌরব’ রক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রথমত, এসব হলো রাজনৈতিক মতলববাজি কথাবার্তা। দ্বিতীয়ত, এসব কথাবার্তার মধ্যে ইসলামিয়াত বা ইসলামী শিক্ষাদীক্ষার কোনো পরিচয় নেই। এ দেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার এবং ইসলামের যে ঐতিহ্য মুসলিম ধর্ম প্রচারকরা তৈরি করে এসেছেন, তার সঙ্গে এসব নব্য ইসলাম ধর্মীয় নেতার কোনো সম্পর্ক নেই। উভয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তারা এই ঐতিহ্যের বাইরে।

কওমি মাদ্রাসার সনদকে যেভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, এটা বর্তমানে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে যে আরও সংকটাপন্ন করবে_ এতে সন্দেহ নেই। কারণ কওমি মাদ্রাসা পাঠ্যক্রমে আধুনিক শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ভাষা ইত্যাদির কোনো অনুশীলন ও চর্চা এদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই। আছে শুধু ধর্ম বিষয়ে কিছু শিক্ষার ব্যবস্থা, যার মধ্যে ইসলামিয়াতের প্রকৃত উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। অথচ কওমি মাদ্রাসার উচ্চতর সনদকে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ডিগ্রির তুল্যমূল্য করে তাদের চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে। এসব মূর্খ যদি ইতিমধ্যে সংকটাপন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে, তাহলে দেশজুড়ে নৈরাজ্য যে আরও বৃদ্ধি পাবে_ এতে সন্দেহ নেই। এর ফলে শিক্ষা থেকে মূর্খতার আদরই এ দেশে বৃদ্ধি পাবে। সমাজের এই পরিণতির জন্য তো এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেনি। কিন্তু ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ কথা অহরহ বলে যে পরিস্থিতি আজ বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে, একে জনগণের জীবনে এক অশনিসংকেত ছাড়া আর কী বলা যায়?

হিন্দুনববার্তা ম্যাগাজিঙ নিউজ ১৯.০৪.২০১৭.

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s